ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চীনের অবস্থা স্পষ্ট—কূটনৈতিক সমাধান চায় বেইজিং। ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে সামরিক পথ নয়, কূটনৈতিক পথেই সংকটের উত্তরণ চায় শি জিনপিং সরকার। একই সঙ্গে এ যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের পুরো বিপক্ষে তারা। চীনের এ কৌশলগত অবস্থানের একমাত্র লক্ষ্য ইরানের পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা। বেইজিং কোনোভাবেই চায় না হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচল বন্ধ হোক। কারণ ইরান এ প্রণালি বন্ধ করে দিলে তা হবে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় ধাক্কা।
বেইজিং এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে—এ যুদ্ধ কেবল অঞ্চল নয়, গোটা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে এবং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো রাজনৈতিক সমাধান। চীনের মতে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানে ইসরায়েলের হামলায় তারা উদ্বিগ্ন। তেহরানে হামলায় যে অজুহাত ইসরায়েল দেখাচ্ছে তা অনেকটা ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের আগের যুক্তির পুনরাবৃত্তি। বেইজিং মনে করে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানকে ‘খলনায়ক’ বানানোর যে ন্যারেটিভ যুদ্ধ চালাচ্ছে, তা এক ভয়ংকর সংঘাতের মঞ্চ তৈরি করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সামরিক অ্যাডভেঞ্চারিজম বলে অভিহিত করেন।
চীন পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, তারা ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করে এবং পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সামরিক সমাধান মেনে নেবে না। এটি ইরান ইস্যুতে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থান। চীন মূলত জাতিসংঘের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির আওতায় ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির অধিকার স্বীকৃত চায়।
চীনের এ কূটনৈতিক অবস্থান কেবল নীতিগত নয়, কৌশলগতও। ২০২১ সালে চীন-ইরান ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চীন বর্তমানে ইরানের শীর্ষ তেল ক্রেতা ও বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইরানের রফতানি করা ৯০ শতাংশ তেল চীনের বাজারেই যায়।
তবে এ মধুর সম্পর্কেও টানাপড়েন আছে। বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পূরণে চীনের ধীরগতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক মাঝেমধ্যেই তেহরানের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করে। তবে দুপক্ষের চাওয়া-পাওয়া স্পষ্ট। চীন চায় নিরবচ্ছিন্ন তেলের সরবরাহ ও আঞ্চলিক প্রভাব, আর ইরান চায় বাস্তবায়িত আর্থিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
তবে ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন সীমাহীন নয়। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়—যেখান দিয়ে বিশ্বের ২৫ শতাংশের বেশি তেল এবং এক-তৃতীয়াংশ প্রাকৃতিক গ্যাস পাড়ি দেয় তাহলে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি হুমকিতে পড়বে। একইভাবে যদি ইরান জাতিসংঘের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে তা বেইজিংয়ের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ করবে।
তবে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী চীন। তবে সেটা শুধু মিত্র ইরানকে বাঁচাতে নয়, অন্য স্বার্থও রয়েছে। ২০২৩ সালে ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে সমঝোতা হয় চীনের মধস্থতায়। যা এ অঞ্চলে বেইজিংয়ের এক বড় কূটনৈতিক কৃতিত্ব হিসেবে দেখা হয়। যদি যুক্তরাষ্ট্রে এ যুদ্ধে অংশ নেয় তাহলে এ অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালাবে ইরান। ফলে বিফলে যেতে পারে চীনের মধ্যস্থতায় হওয়া ইরান সৌদি সমঝোতা।
তবে এখন পর্যন্ত বেইজিং মনে করে ইরানের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত। গত বছর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব পশ্চিমের সঙ্গে সংলাপের প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছে। এর পরপরই ইসরায়েল একাধিক হামলা চালায়—হিজবুল্লাহ ও হামাসকে লক্ষ্য করে, সিরিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে, এমনকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি আঘাত হানে। তেহরানের অপেক্ষাকৃত সংযত প্রতিক্রিয়া হয়তো যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা ছিল। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর মতে, এ ধৈর্য ভবিষ্যতে আরো আগ্রাসনের সাহস জোগাতে পারে। চীন মনে করে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কখনো কখনো প্রতিবাদের চেয়েও বিপজ্জনক। সে হিসেবে আক্রমণের জবাব দিয়ে সঠিক কাজই করেছে তেহরান।